ena
maisha
bioMed

রবীন্দ্রনাথ ও বিশ্বপরিচয়

তপন চক্রবর্তী, ১৫ মে, এবিনিউজ : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গ্রহগণ জীবের আবাসভূমি’ নিবন্ধ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত ও সব্যসাচী লেখক অক্ষয় কুমার দত্ত সম্পাদিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো। এর প্রায় চৌষট্টি বছর পর বিশ্বকবির ‘বিশ্ব পরিচয়’ গ্রন্থ ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয়। এই সময়কালের মধ্যে পরমাণু বিজ্ঞান প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছে প্রায়। রবীন্দ্রনাথের শৈশবে মহান গবেষক ও বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব বা অভিব্যক্তিবাদ প্রচারিত হয়েছিলো। তবে এর বিকাশ ও প্রতিষ্ঠালাভও ঘটে উপরিল্লিখিত সময়কালে।

একই সময়সীমার মধ্যে আইনস্টাইনের সাধারণ ও বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব বিজ্ঞানবিশ্বকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিলো। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদীদের আভ্যন্তরীণ সংকটে পৃথিবী ক্রমে অশান্ত হয়ে উঠেছিলো।

মানুষের কল্যাণী ইচ্ছা ও শুভবুদ্ধি হুমকির মুখোমুখি। একটা মহাযুদ্ধের ক্ষত শুকোতে না শুকোতে আরেকটা মহাযুদ্ধের অনিবার্য সংকটের অশনি সংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নূতন নূতন প্রযুক্তি মানুষের মারণ জিঘাংসায় শান দিচ্ছে। ভারতবর্ষেও সে সবের তরঙ্গাঘাত প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে।

সংগত কারণে, বিশ্বকবির মানবিক ও সচেতন মনে এবং তাঁর সংবেদী হৃদয়ে এ সবের ছায়াপাত ঘটেছে। পৃথিবীর গুটিকয় হাতে গোণা বিবেকবান ব্যক্তিত্বের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ অন্যতম। রবীন্দ্রনাথের এ সময়ে রচিত কাব্য ও গদ্যে যুগের জটিলতা ও যন্ত্রণা বিধৃত হয়ে আছে। এ সময়ের মননধর্মী সৃষ্টিতে এই বোধও ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে, আধুনিক জগতকে বুঝতে এবং যুগযন্ত্রণাকে মোকাবিলা করার লক্ষ্যে আধুনিক বিজ্ঞান সম্বন্ধে সম্যক ধারণা থাকা অপরিহার্য।

জীবনের শেষপ্রান্তে অসুস্থ দেহে ‘বিশ্বপরিচয়’ প্রণয়নের একটা বড় তাগিদ ছিলো এখানে। এই কারণেই তিনি লোকশিক্ষার উপযোগী বিজ্ঞানের বই লেখার কাজকে তিনি বলেছেন, ‘অত্যাবশ্যক কর্ম’। এ ছাড়া তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করেছিলেন যে, পাশ্চাত্যে বিজ্ঞান ব্যাপকভাবে সংস্কৃতির অঙ্গীভূত হয়ে গেছে। সেখানে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়, সহজবোধ্য করে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ প্রণয়নের প্রয়াস শুরু হয়েছে। বিজ্ঞানকে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছানোর এই বিরাট যজ্ঞে শামিল হয়েছেন বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাহিত্যিকবৃন্দ। কবিরাও এতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন।

স্মর্তব্য যে, সপ্তদশ শতকে ইংলন্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জন ড্রাইডেনকেও বিজ্ঞানের জনবোধ্য সহজ পরিভাষা নির্মাণে সহায়তাদানের জন্য রয়্যাল সোসাইটির সদস্য করে নেওয়া হয়েছিলো। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকল মনীষীর সার্বিক অংশগ্রহণের ফলে ইউরোপে সর্বসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে উঠেছিলো। সৃষ্টি হয়েছিলো অনন্য এক বিজ্ঞান সংস্কৃতি।

কবির পরিণত বয়সে এদেশে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগদানন্দ রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় সহ আরো অনেক বিজ্ঞান ও সাহিত্যকর্মীর আন্তরিক প্রয়াস সত্ত্বেও কাঙিক্ষত বিজ্ঞান সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। এই ব্যর্থতা তাঁকে পীড়িত করে। সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নেই হয়তো রবীন্দ্রনাথ ভগ্নস্বাস্থ্যে তাঁর মহা ব্যস্ততার মধ্যেও ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’র মতো প্রকল্প প্রণয়ন করে লেখক বাছাই করেছেন।

তিনি পাঠকের বোধের স্তরের দিকে তীক্ষ্ব দৃষ্টি রেখে লেখকদের লেখার ধরন, বাক্য গঠন, শব্দচয়ন ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালার’ প্রথম গ্রন্থ ‘বিশ্বপরিচয়’ লেখার দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিলো শিক্ষা ভবনের অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রিয় ছাত্র প্রমথনাথ সেনগুপ্তের উপর। কারণ, তাঁর লক্ষ্য ছিলো, লোকশিক্ষাকে জনপ্রিয় করে তোলায় সমর্থ একটি লেখক গোষ্ঠী গড়ে তোলা।

তাঁর প্রারব্ধ কর্মের ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। লোকশিক্ষা গ্রন্থমালার সর্বশেষ এক শত পয়ঁত্রিশতম (ডিসেম্বর,২০০০) সংখ্যক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে এবং গ্রন্থটি বোস সংখ্যায়নের জনক, মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের প্রশংসাধন্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে নিয়ে। গ্রন্থের শিরোনাম ‘বিজ্ঞানসাধনার ধারায় সত্যেন্দ্রনাথ বসু’। রচয়িতা পূর্ণিমা সিংহ। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের প্রায় এক তৃতীয়াংশ বিজ্ঞান বিষয়ক।

‘বিশ্বপরিচয়’ রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত লেখক প্রমথনাথ সেনগুপ্ত গ্রন্থের রচনারীতি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে পরামর্শদান করেছিলেন তা তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেন,

“সাধারণ জ্ঞানের সহজবোধ্য ভূমিকা করে দেওয়াই হবে তোমার

কাজের উদ্দেশ্য। তাই, জ্ঞানের এই পরিবেশনকার্যে পান্ডিত্য

যথাসাধ্য বর্জন করতে হবে। … বিজ্ঞানের প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে

দেবার কাজে পরিভাষাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে সহজ ভাষায় কী করে

রচনা সুসম্বন্ধ করা যায় তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।”

বিশ্বকবি তাঁকে গ্রন্থ রচনায় সকল ধরনের সাহায্য করতে প্রস্তুত ছিলেন। সে প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন,

“আমি বিজ্ঞানের সাধক নই, তবে বিজ্ঞানের সঙ্গে প্রথম পরিচয়

ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা কীভাবে গ্রহণ করতে হবে

ও কী ভাবে লোকশিক্ষাদান সঙ্কল্পকে সার্থক করে তুলতে পারা যায়

সে বিষয়ে নিঃসঙ্কোচে আমার সাহায্য নিতে পার।” প্রমথনাথ সেনগুপ্ত ১৯৩৩ সালে বিশ্বভারতীতে পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপকের পদে যোগদান করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথমে প্রমথনাথকে জেমস জীনস প্রণীত Through Space and Time গ্রন্থটি পড়তে দেন এবং সাহিত্য রসসমৃদ্ধ এই গ্রন্থের আলোকে ‘বিশ্বপরিচয়’লেখার পরামর্শ দেন। কথা ছিলো প্রমথনাথ একটি করে অধ্যায় রচনা করে তা রবীন্দ্রনাথকে দেখাবেন। রবীন্দ্রনাথ দেখবেন কিভাবে সাহিত্যের ভাষা দিয়ে বিজ্ঞানকে জনগণের কাছে সহজবোধ্য করে পরিবেশন করা যায়। অর্থাৎ ভাষার ক্ষেত্রে ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’র মূল লক্ষ্যের সঙ্গে যাতে ‘বিশ্বপরিচয়’–এর ভাষার সঙ্গতি রক্ষা সম্পন্ন হয়।

প্রমথনাথ ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭ এই চার বছর অক্লান্ত শ্রমে ও উদ্যমে রবীন্দ্র নির্দেশিত ভাষায় পান্ডুলিপি নির্মাণ করেন। প্রমথনাথ প্রথম অধ্যায়‘পরমাণুলোক’ লিখে কবিকে দেখালে তিনি লেখা বিষয়ে আবারো মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করেন। প্রমথনাথ তাঁর আনন্দরূপম গ্রন্থে কবির জবানী হুবহু পরিবেশন করেন। কবি বলেন,

“আসল কথা হচ্ছে তথ্য বিন্যাসের নিপুণতা আর এমন একটা নূতন

ধরনের সহজ সরল ভাষায় লিখতে হবে, যার গতি হবে স্বচ্ছন্দ ও যার

ছন্দে শিক্ষার্থীর মনে দোলা লাগবে। বিজ্ঞানের রচনায় একটি জিনিস

বিশেষ ভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। এর নৌকাটা অর্থাৎ এর ভাবটা

যাতে সহজে চলে। সম্পূর্ণ শিক্ষার জন্য পারিভাষিকের প্রয়োজন আছে

বটে তবে সেটা চর্ব্য জাতের জিনিস, দাঁত ওঠার পর সেটা পথ্য।

সেই কথা মনে রেখে বিজ্ঞানের প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে

পরিভাষাকে যথাসম্ভব এড়িয়ে সহজ ভাষায় কি করে রচনা সুসংবদ্ধ

করা যায় তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। এই দিক থেকে ভাষার

ট্রেনিংটা হয়ে গেলে তখন দেখবে স্বচ্ছন্দ গতিতে ভাষা কেমন এগিয়ে

চলে ; জেনে রেখো সহজ কথায় লেখাটাই সবচেয়ে কঠিন। আরো

একটা কথা, বৈজ্ঞানিক রচনা লিখে প্রথমে দেখাতে হবে এমন দুয়েক জনকে, বিজ্ঞানের সাথে যাঁদের পরিচয় নেই। তাঁরা পড়ে যদি বুঝতে পারেন তাহলে নিঃসন্দেহে ধরে নেবে লেখার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে।”

পদে পদে সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন সত্ত্বেও (পরিমার্জনের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে প্রমথনাথ সেনগুপ্তের ‘আনন্দরূপম’ গ্রন্থে), পূর্ণ পান্ডুলিপি পাওয়ার পর, রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে পান্ডুলিপিতে রচনার অনেক অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৭ সালে বিশ্বভারতীতে গ্রীষ্মের ছুটিতে আলমোড়ায় গিয়ে আলোচ্য গ্রন্থের ব্যাপক সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ আলমোড়ার নিভৃত, কোলাহলমুক্ত ও শান্ত পরিবেশে বিশ্বপ্রকৃতির কোলে বসে ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের পান্ডুলিপিতে পরিমার্জনের কাজ সম্পন্ন করেন। আসলে রবীন্দ্রনাথ পান্ডুলিপির খোলনলছে পাল্টে ফেলেন। প্রমথনাথের মূল লেখা ও রবীন্দ্রনাথের পরিমার্জিত পান্ডুলিপির দুটি নমুনা এখানে পরিবেশন করা হচ্ছে যা পড়ে পাঠক নিজেরাই গ্রন্থটি কার নামে প্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিলো তার প্রতি সুবিচার করতে পারবেন।

প্রমথনাথের মূল রচনা :

অনেক আশ্চর্য ও অসম্ভব কথা তোমরা পড়ে ও শুনে থাক।

তোমাদের কল্পনা করার শক্তি যদি তাকে না জেনে নেয়

তা হলে মনে হবে যে, একথা অসম্ভব, এ হতে পারে না।

সকলের চিন্তা করার ক্ষমতা এ নয়, তাই তোমার আমার

কাছে যা অসম্ভব ও আশ্চর্য মনে হয়, আর একজন হয়ত

তা খুবই স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়। সত্য যে কল্পনাকে

কত দূর ছাড়িয়ে যায় তা আজ বিজ্ঞানের যুগে প্রতি

পদেই আমরা টের পাই।

বিশ্বকবির পরিমার্জিত পান্ডুলিপি:

সূর্য আমাদের চারদিকে একটা আলোর পর্দা খাটিয়ে

দিয়েছে। পৃথিবী ছাড়িয়ে আর যে কিছু আছে মানুষকে

তা দেখতে দিচ্ছে না। ভাগ্যক্রমে দিন শেষ হয়, সূর্য

অস্ত যায়, আলোর আবরণ সরে যায়, তখন অন্ধকার

ছেয়ে প্রকাশ পায় নক্ষত্রলোক। বিশ্বব্রহ্মান্ডের কী যে

চেহারা তা আমাদের চোখে ধরা পড়ে। নইলে

সমস্তটার মোটামুটি পরিচয় পেতুম কী করে। হিমালয়

পর্বতটা কীরকম তা জানবার জন্য ছবি আঁকা হয়,

একটা বইয়ের পাতার মধ্যে তা ধরে। কিন্তু হিমালয়কে

যদি একেবারে সামনে এনে দেখাতে চাই তাহলে

সমস্ত বাংলাদেশটা চাপা পড়বে এবং হিমালয়ের

সামান্য এক অংশের বেশি দেখতে পাব না।

প্রমথনাথের মূল রচনা :

নেপচুনের তাপ ফারেনহাইটের শূন্যমাত্রার চারশ’ ডিগ্রি

নিচে। এত শীতে অক্সিজেন–নাইট্রোজেন নিবিড় হয়ে

যায় ; য়ুর্‌েনস বা নেপচুনে এমোনিয়ার কোনো কিছু

পাওয়া যায় না। তার পক্ষে তরল অবস্থায় থাকা

অসম্ভব। ঘন্টায় এক একবার ঘুরে আসছে। উপগ্রহের

দূরত্ব এবং এই গ্রহের আয়তন থেকে হিসেব করা

হয়েছে। যুরেন্‌সের বস্তুপদার্থ জল থেকে কিছু ভারী,

ওজনে প্রায় য়ুরেন্‌সের সমান। কত বেগে এ গ্রহ

মেরুদণ্ডের চারদিকে ঘুরছে তা আজও একেবারে ঠিক

হয়নি।

বিশ্বকবির পরিমার্জিত পান্ডুলিপি :

নেপচুনের আকর্ষণে য়ুরেনসের যে নূতন পথে চলার

কথা তা হিসেব করার পরেও দেখা গেল যে, য়ুরেনস

ঠিক সে পথ ধরেও চলছে না। তার থেকে বোঝা

গেল যে, নেপচুন ছাড়া এ গ্রহের গতিপথের বাইরে

রয়েছে আরো একটি জ্যোতিষ্ক। ১৯৩০ সালে

বেড়িয়ে পড়ল নূতন এক গ্রহ। তার নাম দেওয়া হলো

প্লুটো। এ গ্রহ এত ছোট ও এত দূরে যে দুরবিনেও

একে অনেক কষ্টে দেখা যায়। ক্যামেরা দিয়ে ছবি

তুলে নিঃসন্দেহে এর অস্তিত্ব প্রমাণ করা হয়েছে। এ

গ্রহই সূর্য থেকে সব চেয়ে দূরে, তাই আলো উত্তাপ

পাচ্ছে এত কম যে, এর অবস্থা আমরা কল্পনা করতে পারিনে। প্রায় ৩৯৬ কোটি মাইল দূর থেকে ২৫০

বছরে এ গ্রহ সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে।

বিশ্বভারতীর শিক্ষাভবনের তৎকালীন অধ্যক্ষ ধীরেন্দ্রমোহন সেন প্রমথনাথ সেনগুপ্তের রচিত ‘বিশ্বপরিচয়’–এর পান্ডুলিপি এবং রবীন্দ্রনাথের সংশোধিত–সংযোজিত–বিয়োজিত পান্ডুলিপি বিবেচনা করে মন্তব্য করেন যে, গ্রন্থটির প্রণেতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের নামই মুদ্রিত হওয়া সমীচীন। তা না হলে অন্তত তাঁকে যুগ্ম গ্রন্থকারের মর্যাদা দেওয়া উচিত। প্রমথনাথের রচিত পান্ডুলিপির নাম প্রথমে দেওয়া হয়েছিলো ‘বিশ্বরচনা’। প্রমথনাথের রচনার মধ্যে পৃথিবীর গড়ন বা ভূতত্ত্ব নিয়ে যে অংশটুকু ছিলো সেটা বড় হয়ে যাচ্ছে দেখে রবীন্দ্রনাথ সে অংশ ‘পৃথ্বী পরিচয়’ নামে প্রমথনাথ সেনগুপ্তের নামে প্রকাশের পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’য় ‘পৃথ্বী পরিচয়’ প্রমথনাথের নামে প্রকাশিত হয়। ‘বিশ্বপরিচয়’ সঙ্গত কারণেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে প্রকাশ পায়। এটিই ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালার’ প্রথম গ্রন্থ।

উৎসর্গপত্রে রবীন্দ্রনাথ প্রমথনাথের ঋণ স্বীকার করে লিখেন,

“ তিনি শুরু না করলে আমি সমাধা করতে পারতাম না, তা ছাড়া

অনভ্যস্তপথে শেষ পর্যন্ত অব্যবসায়ীর সাহসে কুলাত না। তাঁর কাছ

থেকে ভরসাও পেয়েছি, সাহায্য পেয়েছি।”

‘বিশ্বপরিচয়’–এর মতো জটিল একটি বিষয় নিয়ে গ্রন্থ প্রণয়নের ব্যাপারে কবি বিনীতভাবে গ্রন্থের মুখবন্ধে অকপটে জবাবদিহি করেছেন এভাবে,

“শিক্ষা যারা আরম্ভ করেছে, গোড়া থেকেই বিজ্ঞানে না হোক, বিজ্ঞানের

আঙিনায় তাদের প্রবেশ করা অত্যাবশ্যক। এই জায়গায় বিজ্ঞানের সেই

প্রথম পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কাজে সাহিত্যের সহায়তা স্বীকার করলে

তাতে অগৌরবের নেই। এ দায়িত্ব নিয়েই আমি এ কাজ শুরু করেছি।

কিন্তু এ জবাবদিহি একা কেবল সাহিত্যের কাছেই নয়, বিজ্ঞানের কাছেও

বটে। তথ্যের যথার্থ্য এবং সেটাকে প্রকাশ করার যথার্থ্য বিজ্ঞান

অল্পমাত্রা স্খলন ক্ষমা করে না। অল্পসাধ্য সত্ত্বেও যথাসম্ভব সতর্ক হয়েছি।”

‘বিশ্বপরিচয়’ প্রকাশিত হয় ১৩৪৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে। ইংরেজি ১৯৩৭ সালে, তাঁর জীবনাবসানের মাত্র চার বছর আগে। এই গ্রন্থের অধ্যায় সংখ্যা পাঁচ : পরমাণুলোক; নক্ষত্র লোক; সৌরজগৎ; ভূলোক এবং উপসংহার। লেখক ভূমিকায় কেন এ ধরনের গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার সুস্পষ্ঠ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ভূমিকায় লিখেছেন,

“ আমাদের মতো আনাড়ি এই অভাব(অর্থাৎ লোকবিজ্ঞান গ্রন্থের অভাব)

অল্পমাত্র দূর করবার চেষ্টাতেও প্রবৃত্ত হলে তারাই সবচেয়ে কৌতুক

বোধ করবে যারা আমাদেরই মতো আনাড়ির দলে। কিন্তু আমার

তরফে সামান্য কিছু বলবার আছে। শিশুর প্রতি মায়ের ঔৎসুক্য আছে

কিন্তু ডাক্তারের মতো তার বিদ্যা নেই। বিদ্যাটি সে ধার করে নিতে

পারে কিন্তু ঔৎসুক্য ধার করা চলে না। এই ঔৎসুক্য শুশ্রূষায় যে রস

জোগায় সেটা অবহেলা করবার জিনিস নয়।”

‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নে অবশ্যই কথা উঠতে পারে। এই ব্যাপারে আলোচনা শুরুর পূর্বে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্ত করা আবশ্যক মনে করি। কালোত্তীর্ণ কবি রবীন্দ্রনাথ সারা জীবনব্যাপী বিজ্ঞানের রস আস্বাদনের আনন্দ উপভোগ করেছেন এবং বাংলা ভাষাভাষী জনসাধারণকে সেই আনন্দের ভাগ দেবার জন্য নানান প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। বিজ্ঞানমনস্ক এই মহান ব্যক্তি যদিও তাঁর প্রণীত ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থের ভূমিকায় বিজ্ঞানের পরিভাষা এড়িয়ে চলার প্রশ্নে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন এই বলে,

“বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ শিক্ষার জন্য পারিভাষিকের প্রয়োজন আছে। কিন্তু

পারিভাষিক চর্ব্য জাতের জিনিস। দাঁত ওঠার পরে যেটা পথ্য। সেই

কথা মনে করে যতদূর পারি পরিভাষা এড়িয়ে সহজ ভাষার দিকে মন দিয়েছি।”

কিন্তু আমরা লক্ষ করেছি গ্রন্থে লেখক নিতান্ত প্রয়োজনবোধে যেটুকু পরিভাষার সাহায্য তিনি নিয়েছেন, তার মধ্যেও তাঁর গভীর ভাষাজ্ঞান এবং সৃজনশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়। উপরিল্লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রকৃতপক্ষে তিনি তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি। বিজ্ঞানের পরিভাষা নির্মাণে তাঁর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। আমরা একটু পরে সে আলোচনায় আসছি।

রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি অনুযায়ী ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর আগ্রহের সূত্রপাত ঘটে সতের বছর বয়সে। ইংল্যান্ডে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গ্রন্থাগারে লোকেন পালিতের সঙ্গে ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আলোচনার সূত্রেই তাঁর এই আগ্রহের সৃষ্টি। রবীন্দ্র রচনাবলির (বিশ্বভারতী প্রকাশিত) ৫ম খন্ডের ২৬ পরিচ্ছেদে কবি তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন যে, লোকেন পালিত তাঁর চেয়ে বয়সে চার বছর ছোট হলেও তাঁর সাথে কবির বন্ধুত্ব সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিলো। লোকেন পালিত বাংলা ভাষার ছাত্র ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে এই সময়ে এক স্কট ছাত্রীকে বাংলা শেখানোর দায়িত্ব নেন। ছাত্রীকে বাংলা শেখাতে গিয়ে তিনি বাংলাভাষার নানান অপূর্ণতা অনুভব করেন। এই সকল বিষয় নিয়ে তিনি লোকেনের সঙ্গে আলোচনা করতেন। লোকেন পালিত ভারতে ফিরে এসে ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। রবীন্দ্রনাথ মাঝে মাঝে লোকেনের কর্মস্থলে বেড়াতে যেতেন। ১৮৯২ সালে লোকেন পালিত যখন রাজশাহীর ম্যাজিস্ট্রেট তখন তাঁর বাংলোয় সর্বশেষ গিয়েছিলেন জানা যায়। তাঁর বাসায় বসে রবীন্দ্রনাথ‘এবার ফিরাও মোরে ’ কবিতা রচনা করেছিলেন। লোকেনের প্রবল উৎসাহে ও পীড়াপীড়িতে তিনি লিখতে শুরু করেন। তিনি বাংলা বানানকে একটি নিয়মের বাঁধনে বাঁধার জন্য ‘শব্দতত্ত্ব’ ও ‘বাংলাভাষা পরিচয়’ শিরোনামে দুটি আকর গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং যথাক্রমে ১৩১৫ বঙ্গাব্দে এবং ১৯৩৮ সালে প্রকাশ করেন। ‘শব্দতত্ত্ব’ পরবর্তী সংস্করণে ১৩৪২ বঙ্গাব্দে ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ নামে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের প্রতিশব্দ অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ পরিভাষা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন। ভাষাতত্ত্ব সম্বন্ধে গবেষণার সূত্রে তিনি বৈজ্ঞানিক পরিভাষা বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। পরিভাষা প্রণয়নের স্বতন্ত্র উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেননি। তবে পরিভাষা সংগ্রহ বা সংকলনে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি ১৩২৬ বঙ্গাব্দে ‘শান্তিনিকেতন’, পত্রিকায় ‘প্রতিশব্দ বিষয়ক নিবন্ধে বলেছেন,

“কেবল পরিভাষা নহে, সকল প্রকার আলোচনাতেই আমরা এমন

অনেক কথা পাই যাহা ইংরেজি ভাষায় সুপ্রচলিত, অথচ যাহার ঠিক

প্রতিশব্দ বাংলায় নাই। ইহা লইয়া আমাদের পদে পদে বাধে।

আজিকার দিনে সে–সকল কথার প্রয়োজন উপেক্ষা করিবার জো নাই।

এইজন্য ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রে আমরা মাঝে মাঝে এ সম্বন্ধে আলোচনা

করিব। আমরা তাহার যাচাই করিতে ইচ্ছা করি। আমি চাই আমাদের

ছাত্র ও অধ্যাপকেরা এ সম্বন্ধে কিছু ভাবিবেন। কোনও শব্দ যদি পছন্দ

না হয়, আর একটি শব্দ যদি তাঁহাদের মাথায় আসে, তবে এই পত্রে

তাহা জানাইবেন।”

রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ‘সারস্বত সমাজ’ নামের এটি প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানের পরমায়ু যদিও খুবই স্বল্প ছিলো, তবু এই প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্রনাথের পরিভাষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে অবদান রাখে। রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’র ‘রাজেন্দ্রলাল মিত্র’ শীর্ষক অধ্যায় পাঠে জানা যায় যে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পুষ্টিসাধন ও পরিভাষা নির্ণয় ছিল আলোচ্য সভার মুখ্য উদ্দেশ্য। সভার প্রথম অধিবেশন বসে ১২৮৯ বঙ্গাব্দের ২ শ্রাবণ। অধিবেশনে রাজেন্দ্রলাল মিত্রকে সভাপতি এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর এবং দ্বিজেন্দ্রলাল ঠাকুরকে সহযোগী সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সম্পাদক কৃষ্ণবিহারী সেন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘সারস্বত সমাজ’ ক্ষীণায়ু হলেও এই সভার অবদান দীর্ঘস্থায়ী। সভার সভাপতি ভাষাতত্ত্বের বিদগ্ধ পণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্র বাংলাভাষায় পরিভাষা সমস্যা নিরসনে পরিভাষা সৃজনের কতিপয় নীতি উল্লেখ করেন। বহুভাষাবিদ ও প্রথম ভারতীয় ভারতত্ত্ববিদ রাজা(ব্রিটিশরাজ প্রদত্ত উপাধি) রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পর্কে বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর. এস শর্মা লেখেন,

”A great lover of ancient heritage, he took a rational

view of ancient society and produced a forceful

tract to show that in ancient times people ate beef.”

মিত্র Antiquities of Orissa (1872) গ্রন্থের লেখক। প্রথমে গ্রন্থাগারিক, পরবর্তীকালে সোসাইটির সহসভাপতি এবং তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার সভাপতি পদে বৃত হয়েছিলেন। ১২৮৯ বঙ্গাব্দেরই ১৭ অগ্রহায়ণ কলিকাতার অ্যালবার্ট হলে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ভূগোলের পরিভাষা গঠনের ব্যাপারে যে সকল দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন তা অন্যান্য বিষয়ে প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হয়েছিলো। তিনি মূলনীতির খসড়াও এই অধিবেশনে পরিবেশন করেছিলেন। পরিভাষা নির্মাণে পথিকৃৎ মিত্র মহাশয়ের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিলো। এ প্রসঙ্গে তিনি ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবর্তিত বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ও বানান বিধির গোড়ার কথা’য় লিখেন,

“রাজেন্দ্রলাল মিত্র সব্যসাচী ছিলেন। তিনি একাই একটি সভা। এই উপলক্ষে তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়া আমি ধন্য হইয়াছিলাম।

সপ্তদশ শতাব্দীর ইংলন্ডে ‘রয়্যাল সোসাইটি’’–কে কেন্দ্র করে যখন নূতন পরীক্ষাভিত্তিক বিজ্ঞানের গোড়াপত্তন করা হচ্ছিলো, তখন সোসাইটির সামনেও পরিভাষা নির্মাণের সমস্যা দেখা দিয়েছিলো। এখানে প্রায় দু’শ বছর ধরে পরিভাষা ও প্রতিশব্দ নিয়ে ভাবা হয়েছে। রয়্যাল সোসাইটি গঠনের পাঁচ বছর পর ১৬৬৭ সালে বিশপ টমাস প্র্যাট এর ইতিহাস প্রণয়ন করেছিলেন। এতে সোসাইটির অধিবেশনসমূহের আলাপ–আলোচনা ও প্রতিবেদন উপস্থাপনের ভাষা বিষয়ে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন তা আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষাবিষয়ক ইশ্‌তেহার বলা যায়। প্র্যাটের বক্তব্য ছিলো :

“সম্প্রতিকালে ব্যবহৃত বাহুল্যমন্ডিত, আপ্রাসঙ্গিক ও কেতাদুরস্ত শব্দ ও

রচনাশৈলী শনাক্ত করুন এবং আদিকালের মানুষের সহজ, সরল ও

স্বল্প কথায় ভাব প্রকাশের রীতিতে ফিরে যান। অতীতের মানুষ

এখনকার মানুষের ব্যবহৃত প্রায় সমসংখ্যক শব্দের সাহায্যে অনেক ভাব

প্রকাশ করতেন। তাঁরা আদিবাসীদের মতো সরল অথচ যথার্থ ভাব

প্রকাশ করে এমন শব্দের কাছাকাছি অর্থবোধক অপর সহজ,

ইতিবাচক ও স্পষ্ট শব্দ ব্যবহার করে মনের ভাব প্রকাশ করতেন।

তাঁরা কামার, কুমোর, হাট–বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ

মানুষের ব্যবহৃত মুখের ভাষা ও শব্দ ব্যবহারের উপর জোর দিতেন। ”

রয়্যাল সোসাইটি স্থির করেন যে, বিজ্ঞানের ভাষা ও শব্দ ব্যবহারকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও সহজ করে পরিবেশন করবেন। এই লক্ষ্যে তাঁরা বিদ্বান ও পন্ডিত ব্যক্তির ভাষার চেয়ে কামার, কুমোর, তথা শ্রমজীবী মানুষের ভাষাকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন। সেই সময়ে ব্রাত্যজনের ভাষাকে বিজ্ঞানের ভাষায় রূপদানের পরিকল্পনা ছিলো এক অসম্ভব দুঃসাহসী প্রয়াস। এ কাজের পৌরহিত্যের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিলো বিজ্ঞানী নয়, একজন কবি বা ভাষাশিল্পীর ওপর। সেই কবি হলেন ড্রাইডেন।

ইংল্যান্ডের সতের দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জন ড্রাইডেন। তিনি ছিলেন সমালোচক, নাট্যকার, অনুবাদক ও ভাষা বিষয়ক পন্ডিত। তাঁকে অনেকে ইংল্যান্ডের ষোল শতকের নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেকসপীয়রের পরে ইংলন্ডের শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে গণ্য করেন।

সঙ্গত কারণে প্রশ্ন উঠতে পারে বিজ্ঞানের ভাষা নির্মাণে ও পরিভাষা প্রণয়নে পৌরহিত্যের দায়িত্ব কবির উপর অর্পণের যৌক্তিকতা কি? রয়্যাল সোসাইটির দৃষ্টান্ত উনবিংশ শতকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কেও (তখনো শ্যামাপ্রসাদ উপাচার্যের পদে বৃত হননি, কিন্তু কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপরিচালনার দায়িত্ব ছিলো তাঁরই হাতে) সম্ভবত প্রভাবিত করেছিলো। তিনি ১৯৩২ সালে বিশ্বকবিকে বাংলাভাষার সার্বিক বিকাশে সহায়তা প্রদান করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আংশিক সময়ের জন্য অধ্যাপক পদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষপঞ্জির প্রথম খন্ডে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করে লেখা হয়ণ্ড

“ডঃ রবীন্দ্রনাথকে দুই বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য

আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁর নিয়োগ ১ আগস্ট, ১৯৩২ থেকে

কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। তিনি প্রতি বছর স্নাতকোত্তর

শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ও নির্দেশনাদানের লক্ষ্যে বাংলা ভাষা ও

সাহিত্যে নির্বাচিত বিষয়ে এক গুচ্ছ বক্তৃতা প্রদান করবেন। এবং সে

সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাভাষায় পাঠদান পদ্ধতি ও

বাংলাভাষার গবেষণা উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়কে সহযোগিতা দান

করবেন। ডঃ রবীন্দ্রনাথকে খন্ডকালীন অধ্যাপকের পদে বৃত করা

হয়েছে।”

কবিকে দিয়ে বিজ্ঞানের ভাষা সমৃদ্ধ করানোর ব্যাপারে পক্ষে –বিপক্ষে বিতর্ক হতেই পারে। সমালোচকের দৃষ্টিতে দেখলে ব্যাপারটাকে তুচ্ছ ভাবা যায় না। কাব্যের ভাষা ও বিজ্ঞানের ভাষা স্বতন্ত্র। কবিতার ক্ষেত্রে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি কাব্যের দাবিতে প্রয়োজনে শব্দকে ভেঙে–চুরে ভাষা নির্মাণে স্বাধীন।

`Poetry is made with words, not with ideas’

বিশ্বকবির মতে,

“যে বাক্য কাব্যের উপাদান,অর্থকে সে অনর্থ করে দিয়ে তবে নিজের

কাজ চালাতে পারে। তার প্রধান কারবার অনির্বচনীয়কে নিয়ে। অর্থের

অতীতকে নিয়ে। কথাকে পদে পদে আড় করে দিয়ে ছন্দের মন্ত্র লাগিয়ে

অনির্বচনীয়ের জাদু লাগানো হয় কাব্যে, সেই ইন্দ্রজালে কাব্য সুরের

সমান ধর্ম লাভ করে।”

এমতাবস্থায় কাব্যশিল্পীকে এ কাজে নিয়োগ কতখানি সমীচীন। কথাটা বিতর্কমূলক হলেও, সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যক্রমে বিজ্ঞানের ভাষা নির্মাণের ও পরিভাষা প্রণয়নের কাজটা কবি বা সাহিত্য সেবীদেরকেই করতে হয়েছে। বাংলাভাষার ক্ষেত্রেও তার অন্যথা ঘটেনি। অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজশেখর বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখেরা মূলত সাহিত্যকর্মী। এঁদের সাহায্য পাওয়া যাওয়াতে লাভ হয়েছে বেশি। ভারতীয় বেতার বা রেডিও ভারতের পরিভাষা ‘আকাশবাণী’ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কী অসাধারণ শব্দ নির্মাণ! সেদিন পশ্চিমবঙ্গের স্নেহাস্পদ এক ব্যক্তি আপসোস করে বলছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো শব্দধানুকি না থাকায় ভারতীয় প্রসার ভারতী প্রবর্তিত ডিশ এন্টেনা ডিটিএইচ (DTH-Direct to Home)-এর পরিভাষা নির্মিত হলো না। সম্ভবত এই ঘাটতির কথা স্মরণে রেখে বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু এই বলে আহ্বান জানিয়েছিলেন,

“আমি সবসময় মনে করি যে, আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের কেবল

বিজ্ঞান জানলেই চলবে না। তাঁদের চেষ্টা চাই যাঁরা বিজ্ঞান বোঝেন না

তাঁদেরও বুঝিয়ে দিতে হবে। এবং সেই মত একটা ভাষা সৃষ্টি করা

তাঁদের দায়িত্ব।”

কবি সাহিত্যিককে বিজ্ঞানের ভাষা নির্মাণের কাজে নিয়োগের ব্যাপারে লেখক দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থে লিখেন,

“ভাষার নাড়িনক্ষত্র না জানলে, শব্দের জগৎ সম্বন্ধে গভীর অনুভব না

থাকলে কথাকে পদে পদে আড়াল করে অনির্বচনীয়ের জাদু লাগানো যায়

না। আর সেই জানার সঙ্গে অনুভবশক্তির সঙ্গে, একটা স্তরে গিয়ে

বিজ্ঞানের ভাষা নির্মাণের কজেরও সংযোগ রচিত হয়ে যায়। তার

কারণ, এখানে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে নতুন করে তৈরি করে

নেওয়ার একটা ব্যাপার থাকে। অনির্বচনীয়কে প্রকাশ করবার জন্য নয়,

এমন তত্ত্ব বা ধারণাকে প্রকাশ করবার জন্য যা দীর্ঘ অনুশীলন, পরীক্ষা–

নিরীক্ষা আর বিমূর্ত চিন্তার ফসল। বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য যদিও

ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, এই বিশ্বেরই উত্তরোত্তর আরো উন্নত বর্ণনায় উপনীত

হওয়া। তবু সেই বর্ণনার ভাষাকে আমরা শাণিত এবং অর্থবহ করে

তুলতে চাইণ্ড যাতে তার প্রতিটি উক্তিই শুধু যথেষ্ট নয়, সঙ্গে সঙ্গে

ক্ষুরধার যুক্তিকেও ধারণ করতে পারে। কিছু সংখ্যক পরীক্ষা–নিরীক্ষা

করে যে সব ফলাফল পাওয়া গেল, সেগুলোকে গুছিয়ে ব্যাখ্যা করার

জন্য প্রয়োজনবোধে বিজ্ঞানী নতুন তত্ত্ব গড়েন। আবার সে তত্ত্বের

বিশ্লেষণ থেকেই নতুন পরীক্ষার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। পরীক্ষা

থেকে তত্ত্ব, তত্ত্ব থেকে পরীক্ষা, এই পরস্পরকে যদি নিত্যনতুনভাবে

ফলপ্রসূ করে তুলতে হয়, তবে সমস্ত বর্ণনা তথা বিশ্লেষণের ভাষাকেই

হতে হবে স্পষ্ট, যথাযথ, দ্ব্যর্থহীন এবং যথাসম্ভব অর্থবহ। তার কারণ

ভাষা এখানে শুধু তথ্যের আধার নয় তাকে হতে হবে নতুন চিন্তার

উদ্রেকের পক্ষে অনুকূল সৃজনশীল বিশ্লেষণের উপযুক্ত বাহন এবং এই

সব কিছুর মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত নতুন তথ্য উৎপাদনের যন্ত্রস্বরূপ।

বিজ্ঞানের ভাষাতেও অবশ্যই সাধারণ ভাষার মত বাক্য থাকে, বাক্যের

মধ্যে পদের বিন্যাস থাকে, কৃতকর্মের অন্বয় থাকে। যুক্তির সুদৃঢ়

বিন্যাসে, তথ্য আর ভাব প্রকাশের অব্যর্থতায়, বিমূর্ত চিন্তার যথাযথ

রূপায়নে, সর্বোপরি পরীক্ষা তথা তথ্যের সদাবিবৃত ডায়ালেকটিকের

সৃজনশীলতায়, তাকে হতে হয় দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে ভাষার

তুলনায় অনেক বেশি ঋজু, নির্ভার, অমোঘ এবং স্ফটিকস্বচ্ছ।”

বিজ্ঞান রচনায় এরকম ভাষা নির্মাণের জন্য যথার্থ প্রতিশব্দ, অর্থবহ পরিভাষা সৃজন অপরিহার্য। বিজ্ঞান রচয়িতার লক্ষ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাস্তব দৃশ্য নিপুণভাবে পরিবেশন করা। এই বর্ণনায়ও পরিবর্তনসাধন আবশ্যক হতে পারে। ফলে ভাষা নিরন্তর পরিমার্জনা দাবি করে। বিজ্ঞানে শাশ্বত বলে কিছু নেই। বিজ্ঞান তাই অব্যাহতভাবে পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে নিজেকে বার বার যাচাই করে চলে। এতে স্বাভাবিক কারণে নূতন নূতন ধারণার জন্ম হতে পারে। নূতন বিশিষ্ট শব্দের মাধ্যমে এসব ধারণার প্রকাশ ঘটাতে হয়। ফলে পারিভাষিক শব্দের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেছিলেন,

“যে শব্দটি উচ্চারণ করিবে, তাহার যেন একটি নির্দিষ্ট

বাঁধাবাঁধি,সীমাবদ্ধ, হেঁয়ালত্বহীন অর্থ থাকে। একটি নির্দিষ্ট শব্দ একটি

নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহার করিবে। সেই শব্দটি আর দ্বিতীয় অর্থে ব্যবহার

করিবে না। এই হইল বৈজ্ঞানিক পরিভাষার মূল সূত্র।”

রবীন্দ্রনাথ এঁদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি। তবে তিনি পরিভাষা নির্মাণে আক্ষরিক অনুবাদের স্থলে ভাষার স্বভাবের দিকে বেশি জোর দেওয়ায় পক্ষপাতী ছিলেন। সে কারণে নিত্য নূতন শব্দ বানানোর চেয়ে মানুষের নিত্য ব্যবহার্য সহজ শব্দ চয়নে তিনি অধিক আগ্রহী ছিলেন। Sympathy শব্দের আভিধানিক প্রতিশব্দ ‘সহানুভূতি’। রবীন্দ্রনাথ ‘সহানুভূতি’র প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন না করে Sympathy’র প্রতিশব্দ করেছেন ‘দরদ’। তাঁর সৃষ্টিশীলতার নমুনা হিশেবে আপজাত্য (degeneracy), অভিযোজন (adaptation), প্রজননতত্ত্ব (genetics), সৌজাত্যবিদ্যা (eugenics), আঙ্গিক (technique), বেগনি পারের আলো (ultraviolet radiation), লাল উজানি আলো (infra-red radiation) ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যায়। ইতোপূর্বে অভিধানে degeneracy–এর প্রতিশব্দ অধঃপতন, ধর্মভ্রষ্টতা ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে আপজাত্য শব্দটিকেও degeneracy–এর প্রতিশব্দ হিসেবে অভিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেরকম ইতোপূর্বে এবং বর্তমানেও adaptation—এর খাপ খাইয়ে নেওয়ায় সমর্থ, genetics–এর বংশগতিবিদ্যা, eugenics–এর সুপ্রজননবিদ্যা, technique–এর কৌশল, সংগীত, চিত্রকলা, ultraviolet radiation–এর অতিবেগুনি রশ্মি, infra-red radiation–

এর অবলোহিত রশ্মি ইত্যাদি প্রতিশব্দ অভিধানে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ প্রণীত প্রতিশব্দ অভিধানে স্থান পায়নি কোন যুক্তিতে তা আমার বোধগম্য নয়। পূর্বে Nation, Race, Tribe, Caste, Genus, Species ইত্যাদি শব্দসমূহের প্রতিশব্দ ছিলো একটি এবং তা হলো ‘জাতি’। রবীন্দ্রনাথ নানা যুক্তি দেখিয়ে ছয়টি শব্দের প্রতিশব্দ করেছিলেন এরকম : Nation অধিজাতি, Race প্রবংশ, Tribe জাতি সম্প্রদায়, Caste জাতি, Genus বর্ণ, Species উপজাতি। রবীন্দ্রনাথ এখানে জাতি শব্দের মূল ভারতীয় অর্থটিকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন। এ সমাজে এখনো ভিত্তি হলো Caste অর্থে জাতি। সামাজিক এসকল ঘটনাকে স্বীকৃতি দিয়েই তিনি অপর শব্দগুলোর প্রতিশব্দ তৈরি করেছেন। সামাজিক ইতিহাস থেকেই এর উত্তরণ ঘটছে যা এই দেশের সমাজ গঠনের একটি বড় লক্ষণ। Tribe–এর মধ্যে এই প্রক্রিয়া এখনো চলছে। তিনি Impulse–এর পরিভাষা করেছিলেন ‘ঘাত’ যা অভিধানে ‘আবেগ’ করা হয়েছে। অভিধানে Solid–এর প্রতিশব্দ ‘কঠিন’, রবীন্দ্রনাথ Solid–এর পরিভাষা করেছিলেন ‘নিরেট’। নিরেট শব্দের আবেদন কঠিন শব্দের মধ্যে আছে কিনা পাঠক বিবেচনা করুন।

রবীন্দ্রনাথ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্পকালীন অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করে যে দুটি ভাষণ দিয়েছিলেন তা তাঁর ‘শিক্ষা’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন ১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে। ভাষণের শিরোনাম‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপ’। দ্বিতীয় ভাষণ ‘শিক্ষার বিকিরণ’ প্রদত্ত হয়েছিলো ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণায় সহায়তা দান করেছিলেন রামতনু লাহিড়ি অধ্যাপক বিজনবিহারী ভট্টাচার্য্য। বিজনবিহারী বৈজ্ঞানিক শব্দের পরিভাষা সংকলন ও বাংলা বানানের শৃংখলা রক্ষায় রবীন্দ্রনাথের উদার সহযোগিতার কথা স্মরণ করেছেন। এই প্রসঙ্গে বিজনবিহারী লিখেছেন,

“গবেষণা প্রসঙ্গে কবি নিজেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট একটি প্রস্তাব

উত্থাপন করেন। তিনি বলেন বাংলা বানানে যে বিশৃঙ্খলা চলিতেছে

তাহার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা স্থাপন করা আবশ্যক এবং এ জাতীয়

কাজের ভার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষেই গ্রহণ করা উচিত। বাংলায়

বৈজ্ঞানিক শব্দের পরিভাষা রচনা ও সংকলনের কথাও তিনি উত্থাপন

করেন।”

রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন করেন এবং এই কাজের জন্য কবিকে একটি পরিকল্পনা তৈরি করার অনুরোধ জানান।

রবীন্দ্রনাথ কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে বিজনবিহারীর সহায়তায় শান্তিনিকেতনে থেকেই পরিভাষা সংকলন ও বানান সংস্কারের কাজ শুরু করেন। অপরদিকে, তিনি তাঁর পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী রাজশেখর বসুকে সভাপতি এবং চারুচন্দ্র ভট্টাচার্যকে সম্পাদক মনোনীত করে একটি কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির অধীনে পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, প্রাণিবিদ্যা, শরীরবিদ্যা ও স্বাস্থ্যবিদ্যা, ভূবিদ্যা, মনোবিদ্যা, অর্থবিদ্যার জন্য উপকমিটি গঠিত হয়। উপকমিটিগুলি ১৯৩৬–১৯৩৭ সালের মধ্যে প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেন। রবীন্দ্র প্রয়াণের প্রায় ১৯ বছর পর ১৯৬০ সালে বিভিন্ন উপকমিটি প্রকাশিত পরিভাষা গ্রন্থগুলোকে একত্রে সংকলিত করে প্রকাশ করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বপরিচয়’ প্রায় সত্তর বছর আগে প্রকাশিত হয় । ইতোমধ্যে জ্যোতির্বিজ্ঞানে অপরিসীম অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানেও অনুরূপ অগ্রগতি ঘটেছে। তাহলে এই গ্রন্থ কি এখনো প্রাসঙ্গিক! একে তো কোনো বিচারে সময়োপযোগী বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বিশ্বপরিচয়’ রচনা করেননি। রচনার প্রকৃত লক্ষ্য ছিলো ‘লোকশিক্ষা’। পূর্বে উল্লেখ করেছি, সতের শতকে ইংল্যান্ডে রয়্যাল সোসাইটি জনসাধারণকে বিজ্ঞানমনস্ক করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে বিজ্ঞান প্রচার ও প্রসারে বিশাল এক কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ গ্রহণ করে। যার তরঙ্গ সমগ্র পাশ্চাত্যে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পাশ্চাত্যে বিশেষত ইউরোপে ব্যাপক বিজ্ঞান সংস্কৃতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রনাথকে অবশ্যই অনুপ্রাণিত করেছিলো। মানুষের মনোজগত ও চিত্তের সম্প্রসারণ এবং মানুষের মনন ও চিন্তায় বিস্ফোরণ ঘটাতে হলে কেবল বিজ্ঞান নয়, জ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও তাঁর অবাধ বিচরণের সুযোগ থাকা বাঞ্ছনীয়। তিনি এর আবশ্যকতা সম্যক অনুধাবন করেছিলেন। ফলে তিনি ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’য় বিভিন্ন বিষয়ের সংযোজন ঘটিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞের সূচনা করেছিলেন। সূচনা হয়েছিলো ‘বিশ্বপরিচয়’ প্রকাশের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে তাঁর Spirit বা দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনাই মুখ্য বিষয়। ‘বিশ্বপরিচয়’–এর পাঠক নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, এই গ্রন্থে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের যে অনবদ্য মেলবন্ধন ঘটেছে তা তুলনাহীন। বইটির সাহিত্যগুণ এমনই স্বতঃপ্রকাশিত যে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধে বক্তব্যকে সহজ ও স্বচ্ছ করে উপস্থাপন করতেন এবং শব্দপ্রয়োগও করতেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে। একই রীতি ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থেও লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞান যাঁদের জীবিকা ও পেশা, তাঁদের বিজ্ঞান বিষয়ক রচনায় এসব গুণ দীর্ঘ চর্চার মাধ্যমে পরিস্ফুট হয়। বিজ্ঞানকর্মীর নিকট থেকে রসের দাবি বাহুল্যমাত্র। রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানের মনস্তত্ত্ব পরিবেশনে যেমন দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন, তেমনি কঠিন ও জটিল বিষয়কে মনোগ্রাহী করায় মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। বিষয় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও ব্যাপক জ্ঞান না থাকলে যা কখনো সম্ভব হতে পারে না। লক্ষ্যণীয়, বিজ্ঞান প্রচার প্রসারে তাঁর যে ভাবনা সক্রিয় ছিলো, বিজ্ঞান প্রচারে ও ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও তাঁর একই ভাবনা কাজ করেছে। তাঁর ভাবনার মূল লক্ষ্য ছিলো, মানুষ যাতে বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠে এবং এ ব্যাপারে মানুষ যাতে যথার্থ দিক নির্দেশনা লাভ করে। বিগত সত্তর বছরে ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’য় শতাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং এসবের প্রায় এক তৃতীয়াংশই বিজ্ঞান বিষয়ক। তথ্যের বিন্যাসে ভারসাম্য রক্ষায়, ভাষার মাধুর্যে, শব্দচয়নে, সহজবোধ্য ও অর্থবহ পরিভাষা ব্যবহারে ও সাহিত্যের প্রসাদগুণের বিবেচনায় প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের কোনোটি ‘বিশ্বপরিচয়’–এর সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। এখানেই বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যে ‘বিশ্বপরিচয়’–এর অনন্যতা। প্রকৃতপক্ষে , ‘বিশ্বপরিচয়’ মাতৃভাষায় বিজ্ঞান সাহিত্য রচয়িতাদের ধ্রুবতারা।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সারা জীবনের বিজ্ঞানচিন্তার সর্বশেষ ফসল ‘বিশ্বপরিচয়’ অন্যতম যোগ্য বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে উৎসর্গ করেছিলেন এবং সে সঙ্গে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রজ্বলিত শিখা অনির্বাণ রাখার মহান দায়িত্বও তাঁর উপর অর্পণ করেছিলেন। বিশ্বে যতোদিন মৌলিক কণার অস্তিত্ব থাকবে ততোদিন ‘বোসন’ পরিচয়ের মধ্যে দিয়ে এই অসাধারণ মেধার কৃতী বাঙালি বিজ্ঞানীর নাম বিশ্বজুড়ে কীর্তিত হবে। আইনস্টাইন প্রশংসিত ‘বোস সংখ্যায়ন তত্ত্বের’(এই সূত্রের সারমর্ম হলো পদার্থের সংগঠনের কণাসমষ্টির সমষ্টিগত ধর্ম তাদের স্বধর্ম থেকে আলাদা। কাজেই কণার পৃথক পৃথক ধর্মকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের আচরণ বোঝার জন্য সমষ্টিগত ধর্মের উপরই গুরুত্ব দিতে হবে।) প্রণেতা, প্ল্যাঙ্ক, শ্রুডিংগার, হাইসেনবার্গ–বোর–পাউলি–ফার্মি–ডিরাক প্রমুখ বিশ শতকের বিশ্বশ্রুত বৈজ্ঞানিকদের সাথে যাঁর নামটি সমুচ্চারিত হয়, সেই বরেণ্য বিজ্ঞানী হলেন বাঙালির গর্ব সত্যেন্দ্রনাথ বসু। রবীন্দ্রনাথ উৎসর্গপত্রে লিখেন

“এই বইখানি তোমার নামের সঙ্গে যুক্ত করছি। বলা বাহুল্য, এর মধ্যে

এমন বিজ্ঞান সম্পদ নেই যা বিনা সংকোচে তোমার হাতে দেবার

যোগ্য। তাছাড়া, অনধিকার প্রবেশে ভুলের আশঙ্কা করে লজ্জাবোধ

করছি, হয়তো তোমার সম্মান রক্ষা করাই হল না।”

পূর্বে উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রিয় ছাত্র, বিশ্বভারতীর পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক প্রমথনাথ বসুর উপর ‘বিশ্বপরিচয়’ রচনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন। ‘বিশ্বপরিচয়’ রচনা ও উৎসর্গ প্রসঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

“সবাই যেমন যায়, আমিও তেমনি শান্তিনিকেতনে গেছি একবার।

তখন সেখানে আমার ছাত্র প্রমথনাথ সেনগুপ্ত বিজ্ঞানের অধ্যাপক।

আমি যখন রবীন্দ্রনাথের কাছে যাই, তখন প্রমথ সঙ্গে ছিলেন।

প্রমথকে বিজ্ঞানের একখানা বই লেখার ভার দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

সেটি রবীন্দ্রনাথ দেখেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেই লেখা সম্পূর্ণ

করেন। তিনি এই বইয়ের নাম দেন ‘বিশ্বপরিচয়’। আমাকে বইটি

দেখে দিতে বলেছিলেন। আমি রাজী হইনি। তিনি লিখেছেন তাই

আমাদের ভাগ্য। তাঁর লেখা আমি কি দেখব! পরে দেখলুম,

‘ প্রীতিভাজনেষু’ সম্বোধন করে ‘বিশ্বপরিচয়’ তিনি আমার নামের সঙ্গে

যুক্ত করেছেন।”

রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে তাঁকে যে বিরল সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন তা সত্যেন্দ্রনাথকে নিশ্চয়ই গভীরভাবে আপ্লুত করেছিলো। এই ঘটনা নিঃসন্দেহে পরবর্তীকালে সত্যেন্দ্রনাথকে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান প্রচারের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় এবং একাজে আত্মনিয়োগে উৎসাহিত হওয়ায় সাহস ও প্রেরণা যুগিয়েছিলো। (সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি